দ্য প্রফেসর “আর্সেন ওয়েঙ্গার”

১৯৯৬ সালের আগস্ট মাসের শুরুর দিকের কথা। বোর্ডের সাথে খেলোয়াড় ট্রান্সফার নিয়ে বিতর্কের কারণে নতুন সিজন শুরুর মাত্র কয়েকদিন আগে অপ্রত্যাশিতভাবে বরখাস্ত করা হলো তৎকালীন আর্সেনাল ক্লাব ম্যানেজার ব্রুস রিয়ককে, চারিদিকে প্রশ্ন উঠলো আর্সেনাল বোর্ডের প্রকৃতিস্থতা নিয়ে। আর সবার চোখ যখন ইয়োহান ক্রুইফের দিকে, সেদিকে ভ্রুক্ষেপ না করে পরের মাসেই ক্লাবের নতুন ম্যানেজার হিসেবে নিয়োগ করা হলো ফরাসি কোচ আর্সেন ওয়েঙ্গারকে।


চারিদিকে সমালোচনার ঝড় উঠলো। এমনকি সমর্থকগোষ্ঠীও ঠিক ভালোভাবে নেয়নি ওয়েঙ্গারের এই নিয়োগ। কেউ কেউ সরাসরি প্রশ্ন ছুঁড়ে দিতেও ভুল করেনি। তবে দিন যত গিয়েছে, ওয়েঙ্গার নিজেকে প্রমাণ করেছেন। নিজেকে ধীরে ধীরে তুলে নিয়েছেন খ্যাতির শিখরে, হয়ে উঠেছেন আর্সেনালের সমার্থক! আজকে বলা হবে তারই গল্প।

‘দ্য প্রফেসর’ নামে পরিচিত এই মানুষটির জন্ম ১৯৪৯ সালের ২২ অক্টোবর, ফ্রান্সের আলসেশ প্রদেশের রাজধানী স্ট্রাসবার্গে অবস্থিত ছোট একটি গ্রাম ডুপিগহাইমে। তার বাবার নাম আলফোনস ওয়েঙ্গার এবং মায়ের নাম লুসি ওয়েঙ্গার। তিন ভাই-বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন তৃতীয়। প্রকৃতির অদ্ভুত খেয়াল, জন্মের পর থেকেই বাবা-মা যেন আঁচ করতে পেরেছিলেন তাদের ছোট্ট সোনামণি আর্সেনালের হয়ে ডাগআউট কাঁপাবে; তাই হয়তো নামটাই রেখে দিলেন ‘আর্সেন’!

ওয়েঙ্গার পরিবারের আর্থিক অবস্থা খুব একটা ভালো ছিল না। বাবার গাড়ির খুচরা যন্ত্রপাতির ব্যবসা আর মায়ের একটি ছোট্ট রেস্তোরাঁ- এই ছিল তাদের আয়ের উৎস। সেগুলো থেকে যে আয় হতো, তা দিয়ে তিন সন্তানের পড়াশোনা ও যাবতীয় খরচ বহন করা সম্ভব ছিল না তাদের পক্ষে। তাই আলফোনস ওয়েঙ্গার ব্যবসার পাশাপাশি বাড়ি থেকে দশ মাইল দূরে অবস্থিত ডাটেলহাইম গ্রামের ফুটবল টিমের কোচের চাকরি নিলেন। তবে সমস্যা হলো, চাকরির কারণে বেশিরভাগ সময় তাকে পরিবার থেকে দূরে থাকতে হতো। তাই পরিবারকে যথেষ্ট সময় দেওয়ার প্রচণ্ড ইচ্ছা মাথায় নিয়ে সপরিবারে ডাটেলহাইমে চলে আসেন তিনি। তাছাড়া সেখানে শিশু-কিশোরদের পরিচর্যার জন্যে আলাদা সুব্যবস্থা ছিল। তাই একদিক দিয়ে ভালোই হয়েছিল, তার ছেলেমেয়েরা বিনা খরচে সেখানকার স্কুলে পড়াশুনার সুযোগ পেল।

ডাটেলহাইম গ্রামটির অবস্থান জার্মান সীমান্তের খুব কাছাকাছি হওয়ার কারণে সেখানকার অধিকাংশ মানুষ আলমেনিক উপভাষায় কথা বলতো। স্কুলে ভর্তি হওয়ার আগেই ওয়েঙ্গার সেই ভাষায় পারদর্শী হয়ে উঠেন। পরে স্থানীয় ক্যাথলিক চার্চ দ্বারা পরিচালিত এক স্কুল থেকে প্রাথমিক শিক্ষা লাভ করেন। তিনি ছোটবেলা থেকেই খুব মেধাবী ছাত্র ছিলেন, স্কুলের বিভিন্ন পরীক্ষায় তার ফলাফলও খুব ভালো ছিল। সেই মেধার জোরেই তিনি ওবারনাইয়ের একটি স্কুলে মাধ্যমিক শিক্ষার সুযোগ পান।

ফুটবলার ওয়েঙ্গার
খেলোয়াড় হিসেবে ওয়েঙ্গারের অর্জনের খাতা খুব একটা পরিপূর্ণ নয়। বিভিন্ন অপেশাদারি ক্লাবে খেলার পরে পেশাদার ফুটবলার হিসেবে ক্যারিয়ার শুরু করতে তার বেশ সময় লেগে গিয়েছিল। অথচ বাবা স্থানীয় জুনিয়র ক্লাবের কোচ হওয়ার কারণে মাত্র ছয় বছর বয়সেই তিনি ফুটবলের খেলার সংস্পর্শে আসেন। তাছাড়া প্রায়ই বাবার সাথে জার্মানির বুন্দেসলিগার ম্যাচ দেখতে যেতেন। তখন থেকেই তার মধ্যে ফুটবল খেলার প্রতি আলাদা টান তৈরি হয়। ডাটলেনহাইম অঞ্চলটি অপেশাদারি ফুটবলের জন্যে বেশ সুপরিচিত ছিল। কিন্তু জনসংখ্যা অনেক কম হওয়ার কারণে সমবয়সী খেলোয়াড়দের নিয়ে একটি দল গঠন করা ছিল কষ্টসাধ্য। তার বয়স যখন বারো, তখন বাবার দায়িত্বাধীন দলের হয়ে অপেশাদারি ফুটবলে পা রাখেন ওয়েঙ্গার।
বাবার অধীনে খেলতে তিনি বেশ পছন্দ করতেন। তাছাড়া ভাইবোনদের মধ্যে তারই বাবার সাথে সখ্যতা ছিল বেশি, তাই বাবার দলে খেলতে পারাটা তার জন্য ছিল পরম আরাধ্য এক প্রাপ্তি। পনের বছর বয়স পর্যন্ত তিনি বাবার অধীনেই স্থানীয় ক্লাবে খেলতেন এবং তিনি দলের গুরুত্বপূর্ণ একজন খেলোয়াড় ছিলেন। তাই তার নির্দেশ না পাওয়া পর্যন্ত জুনিয়র টিম ছেড়ে অন্য কোথাও যোগদান করেননি।

শারীরিক বৃদ্ধি কিছুটা ধীর হওয়ার কারণে পেশাদারী কোনো ক্লাবে খেলার জন্যে তার বেশ কিছু দিন অপেক্ষা করতে হয়েছিল। তার বয়স যখন ষোল, তখন এফ.সি ডাটলেনহাইমের মূল দলে খেলার সুযোগ পান ওয়েঙ্গার। সেখানে খেলোয়াড়দের কৌশলগতভাবে প্রস্তুত করার জন্যে ক্লাবের আলাদা কোচ ছিল না, তাই দলের যেকোনো একজন খেলোয়াড় প্রশিক্ষণ সেশনগুলো পর্যবেক্ষণ করতো। বেশিরভাগ সময়েই ওয়েঙ্গার নিজেই সেই দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিতেন। দলের সতীর্থ ক্লদ তার দল পরিচালনার গুণ নিয়ে বলেছিলেন- “আর্সেন আমাদের দলের অধিনায়ক ছিলো না, তবে দায়িত্বটা সে নিজের থেকেই নিয়ে নিতো। ‘তুমি এটা করো, তুমি ওটা করো’… যেন সে-ই ছিল আমাদের দলনেতা।”


আর্সেন ওয়েঙ্গারের পেশাদারি ফুটবল জীবন শুরু হয় ১৯৬৯ সালের দিকে, এ.এস মুটজিগ ক্লাবের মাঝমাঠের খেলোয়াড় হিসেবে। তখন সেই ক্লাবের কোচ ছিলেন ম্যাক্স হিল্ড। কোচের সাথে তার খুবই ভালো সম্পর্ক ছিল। এমনকি ওয়েঙ্গার কোচ হবার অনুপ্রেরণা পেয়েছিলেন তার কাছ থেকেই। কোচ হিল্ড পরে ঐ ক্লাব ছেড়ে দিলে ওয়েঙ্গারও ১৯৭৩ সালে মুলহাউজ ক্লাবে যোগ দেন।

খেলাধুলায় এতো ব্যস্ত থাকার পরেও ওয়েঙ্গার পড়াশোনা বন্ধ করেননি। মুলহাউজে যোগ দেওয়ার আগে কিছুদিন মেডিসিন নিয়ে পড়ার পর, ১৯৭১ সালে তিনি স্ট্রাসবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন রাজনীতি ও অর্থনীতি নিয়ে পড়তে।

স্ট্রসবার্গের হয়ে মোনাকোর বিরুদ্ধে মাঠে আর্সেন ওয়েঙ্গার; Source: Offside
১৯৭৪ সালে এফ.এস.ভি স্টর্সবার্গ থেকে তার ডাক আসে। সেখানে তিন বছর তিনি খেলোয়াড়ের পাশাপাশি কোচের সহকারির দায়িত্ব পালন করতেন। পরে ১৯৭৮ সালের দিকে তার পুরনো কোচ হিল্ড আর.সি স্টর্সভার্গের রিজার্ভ টিমের কোচ হলে, তিনি ওয়েঙ্গারকে দলে ভেড়ানোর চেষ্টা করেন। ছোটবেলা থেকে সমর্থন করা ক্লাবে খেলতে পারাটা তার জন্যে সৌভাগ্যের ব্যাপার ছিল, তাই সহজেই তিনি কোচের প্রস্তাবে রাজি হয়ে যান। সে বছরের নভেম্বর মাসে তিনি মূল দলের হয়ে প্রথমবারের মতো উয়েফা চ্যাম্পিয়নস লিগের একটি ম্যাচ খেলেন। পরে মোনাকোর বিরুদ্ধে লিগের একটি ম্যাচ খেলার সুযোগ পান।

আটাশ বছর বয়সী ওয়েঙ্গারের তখন ক্যারিয়ারের পড়ন্ত সময়, সেভাবে মূল একাদশে সুযোগও পাচ্ছিলেন না। তবুও তা নিয়ে কখনও আক্ষেপ করেননি, উপরন্তু নিজের সর্বোচ্চ দিয়ে চেষ্টা করেছিলেন দলের পক্ষে যথেষ্ট অবদান রাখার। স্ট্রাসবার্গ সে বছর লিগ শিরোপা জেতে, এরই মধ্য দিয়ে পেশাদার ফুটবল জীবন শুরুর প্রায় নয় বছর পর ওয়েঙ্গার প্রথমবারের মতো শিরোপা জয়ের স্বাদ পান।

১৯৭৯ সালে সিনিয়র দলের হয়ে শেষ ম্যাচ খেললেও, আরও দুই বছর তিনি স্ট্রাসবার্গের রিজার্ভ টিমের কোচ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পরে ১৯৮১ সালে তিনি প্যারিস থেকে ফুটবল ম্যানেজারদের ডিপ্লোমা পাশ করেন। মাঝামাঝি সময়ে তিনি ইংরেজি ভাষা শিক্ষার উদ্দেশ্যে ক্যামব্রিজে তিন সপ্তাহের একটি কোর্সে ভর্তি হন। ইংরেজি এবং ফরাসি ভাষা ছাড়াও ওয়েঙ্গার জার্মান ভাষায় অনর্গল কথা বলতে পারেন; এর পাশাপাশি তিনি ইতালীয়, স্প্যানিশ এবং জাপানি ভাষায়ও যথেষ্ট পারদর্শী।

ম্যানেজার হিসেবে আর্সেন ওয়েঙ্গার
পেশাদার ফুটবলার হিসেবে ক্যারিয়ারের ইতি টানার পর ১৯৮৩ সালে তিনি বেশ কিছুদিন এ.এস ক্যানি ক্লাবের সহকারি কোচের দায়িত্ব পালন করেন এবং পরের বছরই প্রধান কোচ পদে উন্নীত হন। প্রথম দুই মৌসুমে কোনোরকমে দলকে রেলিগেশন থেকে বাঁচালেও তৃতীয় মৌসুমে গিয়ে শেষ রক্ষাটি আর হয়নি। ক্লাবের রেলিগেশনের সাথে সাথে ওয়েঙ্গারকেও কোচের পদ থেকে বরখাস্ত করা হয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *