টলকিনের ফ্যান্টাসির জগতে অণুভ্রমণ দ্য হবিট এবং দ্য লর্ড অব দ্য রিংস

কিছুটা কল্পনা, কিছুটা বাস্তবতা আর কিছুটা পারিপার্শ্বিকতা মিলিয়েই লেখক আর তার লেখনী। আমরা সবসময় লেখনী কিংবা গল্প সম্পর্কে জানতে উদগ্রীব থাকি। কখনো জানতে ইচ্ছা হয় না লেখকের মনের গঠন কিংবা গল্পের অন্তরালে লেখকের গল্পটা কী। তাই আজ চলে যাবো এক লেখকের মনের গহীনে। জে আর. আর. টলকিন আর তার অনবদ্য দুই সৃষ্টি দ্য হবিট এবং দ্য লর্ড অব দ্য রিংস নিয়ে আজকের অণুভ্রমণ। টলকিন কীভাবে প্রতিটি চরিত্রকে প্রাণ দিয়েছেন এবং প্রতিটি গল্পের অনুপ্রেরণাই বা পেয়েছেন কোথা থেকে এমন সব প্রশ্নের উত্তর মিলবে আজকের এই লেখায়।

হবিটন
মিস্টি মাউন্টেন (Misty Mountain), যে পর্বতের ভাঁজে ভাঁজে বিপদ আর রহস্য ওঁতপেতে থাকে। ওপারে দুর্গম আর বিপদসংকুল পাহাড় আর এপারে শায়ার; পাহাড়, নদী আর সবুজে ভরা এক অঞ্চল। শায়ারের ছোট্ট গ্রাম হবিটন। ছিমছাম বলতে যা বোঝায় ঠিক তা-ই। এখানে জীবন বয়ে যায় জীবনের মতোই। নেই কোনো যান্ত্রিকতা কিংবা আধুনিক মানুষের মতো উদ্ভট আর অসামঞ্জস্যপূর্ণ প্রতিযোগিতা। হবিটদের বাস সেখানেই। মাঠের পর মাঠ সবুজ শস্য, গাজর, বাঁধাকপির চাষ। শায়ারের আকাশে বাতাসে তাজা ফসলের ঘ্রাণ। ছোট ছোট নদী, কাঠের ঘ্রাণ, অলস বিকালের তন্দ্রাচ্ছন্নতা সবই হবিটদের রক্তে রক্তে।

টলকিনের কল্পনার হবিটরা আধুনিক যুগের মানুষ না, বরং তারা আধুনিক মানুষ থেকে যোজন যোজন দূরে থাকতেই পছন্দ করে। তাদের মাঝে নেই কোনো অতিরিক্ত ঔৎসুক্য, কখনো জানতে ইচ্ছা হয় না ওপারে (শায়ারের ওপারে) কী আছে, কারা থাকে, কীই বা তাদের হালচাল। তাদের দৌড় হবিটন পেরিয়ে শায়ার পর্যন্তই। কেউ কখনো এর বাইরে পা মাড়ায়নি।

আধুনিকতা বলে কোনো শব্দ হবিটরা জানে না। হবিটরা আকারে গড়পড়তা মানুষের চেয়ে খাটো, তবে বামন নয়। উচ্চতায় ২-৪ ফুটের বেশি নয়। ভোজনরসিক হবিটরা ঘরকুনো স্বভাবের। একজন আদর্শ হবিট মানেই ভোজনরসিক, আরামপ্রিয় আর প্রাত্যহিকতায় বিশ্বাসী। একই সূর্যোদয়, একই হবিট হোল (হবিটদের ঘর), একই প্রতিবেশী আর তাদের জীবনযাত্রা কখনো তাদের একঘেয়ে করে না। বরং প্রতিটা দিন তাদের কাছে আলাদা। একই রং প্রতিদিন তাদের কাছে ভিন্নভাবে ধরা দেয়। একই বাতাসের গুনগুন তাদের মনে একইভাবে আরাম ছড়িয়ে দেয়। প্রাত্যহিকতার কোনো ব্যত্যয় তারা পছন্দ করে না। আর অ্যাডভেঞ্চার? এমন কোনো শব্দই হবিটদের প্রাগৈতিহাসিক অভিধানে নেই।

চিরাচরিত সুখী মানুষের প্রতিনিধিত্ব করে তারা। এখানে নারী পুরুষ সবাই পরিশ্রম করে। দিনে কমপক্ষে ৫ বার খাবার খাওয়া তাদের দৈনন্দিন রুটিন। খাবার পর কাজ আর কাজের ফাঁকে ফাঁকে বিশ্রাম। প্রায় সব হবিটই বাগান করতে ভালবাসে। সন্ধ্যায় গ্রাম্য সরাইখানায় চলে অফুরন্ত হাসি-ঠাট্টা আর বিয়ারের স্রোত। হাসি গল্প আর আনন্দে মেতে উঠে জীবন। শান্ত, প্রাচীন আর গ্রাম্য জীবন বলতে যা বোঝায় শায়ারের হবিটন তা-ই। এখানকার শিশুরা বেড়ে ওঠে শস্যের মনমাতানো ঘ্রাণে, বেড়ে ওঠে শায়েরের ছোট ছোট নদীর মতো টগবগিয়ে। যন্ত্র বলতে আমরা যা বুঝি সেসবের সাথে পরিচয় নেই তাদের। যন্ত্র বলতে তারা বোঝে হবিটনের দ্য গ্রেট মিল, যেটা মূলত ময়দা তৈরীর কারখানা। এই ছিল টলকিনের কল্পনার হবিটন।

১৮৯৬ সালে ৪ বছর বয়সে টলকিন মা এবং ভাইয়ের সাথে সেরহোলে পাড়ি জমান। ইংল্যান্ডের বারমিংহাম থেকে ৪ মাইল দূরে তৎকালীন উত্তর ওরসেস্টারশায়ারের ছোট্ট একটি গ্রাম সেরহোল। বাবার চাকরিসূত্র টলকিনরা দক্ষিণ আফ্রিকায় থাকতেন। সেখানেই টলকিনের জন্ম। দক্ষিণ আফ্রিকার রুক্ষ ও গ্রীষ্মমন্ডলীয় আবহাওয়ায় বেড়ে ওঠা টলকিন সেরহোলের অবারিত বিস্তৃত সবুজ ক্ষেত আর গাছের সারি দেখে অবাক হয়ে যান। ছোট্ট টলকিনের শৈশব কেটে যায় সেসব ফসলী ক্ষেত, নদীর তীর এবং সেরহোলের আশেপাশের জঙ্গলে ভাইয়ের সাথে দুরন্তপনা করে।

তিনি বলেন, আপনি যদি বিলবো ব্যাগিন্সের গ্রাম হবিটন কিংবা শায়ারকে অনুভব করতে চান তাহলে আপনাকে সেরহোলে আসতে হবে। ছোট্ট টলকিন নিজের অজান্তেই ভালবেসে ফেলেন সেরহোলের প্রকৃতিকে, মানুষগুলোকে। এভাবেই ধীরে ধীরে প্রতিটি শিশুর মাঝে দেশপ্রেম জন্মায়।

সেরহোলের মানুষগুলোর জীবনযাত্রা হবিটদের মতোই। শান্ত, নিরবিচ্ছিন্ন। অধিকাংশই কৃষিজীবী। তারা খেতে ভালোবাসে। ভালবাসে খোশগল্পে মেতে উঠতে। ভালবাসে আকন্ঠ বিয়ার পান করে সরাইখানায় পড়ে থাকতে।

ছোটবেলায় টলকিন আর তার ভাইয়ের সবচেয়ে উত্তেজনাকর সময় কাটতো সেরহোল মিলে, যেটাকে তিনি দ্য লর্ড অব দ্য রিংসে ‘দ্য গ্রেট মিল’ বলে অভিহিত করেছেন। ১৭৫৬ সালে কোল নদীর তীরে গড়ে ওঠে এই মিলটি। মূলত ভুট্টা পিষে ময়দা বানানো হতো এই মিলটিতে। টলকিন এবং তার ভাই হিলারি মিলের মালিককে খুব বিরক্ত করতেন। আসলে বিরক্ত করে মজা পেতেন। মিলার টেড স্যান্ডিম্যান ক্ষেপে গিয়ে তাদের খুব বকাঝকা করতেন। এতে আরো মজা পেতেন দুই ভাই। তাই নিয়মিত বিভিন্নভাবে মিলারকে ক্ষেপানোর চেষ্টা করতেন দুজনই।

ধীরে ধীরে টলকিন শৈশব থেকে কৈশোরে পা দিলেন। এদিকে টলকিনের মাতৃভূমি ইংল্যান্ড ধীরে ধীরে হুমকির মুখে পড়ছিল। টলকিন দ্য হবিট এবং দ্য লর্ড অব দ্য রিংস এ বারবার শ্যাডো অর্থাৎ কালো ছায়ার কথা বলেছেন। শায়ারে সুখ-শান্তির দিন শেষ হয়ে আসবে, নেমে আসবে অশুভ কালো ছায়া। গ্রাস করবে পুরো শায়ারকে। তছনছ নয়ে যাবে শায়ারের সবুজ। অজানা আশঙ্কায় কেঁপে উঠে হবিটদের বুক। ফ্রডো ব্যাগিন্স সেই অশুভ শক্তির হাত থেকে থেকে শায়ারকে বাঁচাতে জীবন বাজি রাখে। শায়ারকে পেছনে ফেলে বেরিয়ে পড়ে অজানার উদ্দেশ্যে। ধ্বংস করতে হবে রিংটাকে। লক্ষ্য মাউন্ট ডুম। পৃথিবীর একমাত্র স্থান যেখানে রিংটাকে ধ্বংস করা যাবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *