‘ক্যাডার’ হয়ে ওঠার সংগ্রাম একজন মৃত সুসান পটার এবং তার জীবন্ত

কর্কশ স্বরে বেজে উঠলো অফিসের টেলিফোন। দুপুরের খাবারের বিরতির কারণে এখন অনেকেই অফিস ক্যান্টিনে ভিড় জমিয়েছে। তাই এই অসময়ে ফাঁকা অফিসে ফোন ধরার মানুষ কেউ নেই। কয়েকবার বেজে শেষপর্যন্ত টেলিফোনটি শান্ত হয়ে গেলো। এর ঠিক ১৫ মিনিট বাদে অফিস সহকারী জিম হিথ আহার সেরে অফিসে ফিরলেন। টেবিলের উপর রাখা মগ নিয়ে তিনি দ্রুত কফি মেশিনের কাছে চলে গেলেন। গরগর শব্দ করে মেশিন চালু হলো। মগের পুরোটা তিনি কফি দ্বারা পূর্ণ করলেন। এরপর এক চুমুক দিয়ে তিনি টেবিলের উপর রাখা ফাইলগুলো নেড়ে চেড়ে দেখছিলেন। ঠিক তখনই আচমকা বিকট শব্দে টেলিফোন বেজে উঠলো, ‘ক্রিং ক্রিং ক্রিং’! হঠাৎ টেলিফোনের শব্দে যেন চমকে উঠলেন জিম। হাতে থাকা মগ থেকে কিছুটা কফি উপচে গায়ের এপ্রোনের উপর গিয়ে পড়লো। জিম ‘ধ্যাৎ’ বলে বিরক্তি প্রকাশ করলেন। এরপর কোনোমতে টেলিফোনের রিসিভার কানে তুললেন। অপরপ্রান্ত থেকে খনখনে গলায় এক বুড়ির কণ্ঠ শোনা গেলো।

“এটা কি জনাব স্পিৎজারের অফিস? আমি সুসান পটার বলছিলাম।”

“জ্বি, এটা স্পিৎজারের অফিস। কিন্তু তিনি এখন অফিসে নেই। আমি তার সহকারি জিম হিথ বলছি।”

“আচ্ছা, ঠিক আছে। তাহলে আমি পরে আবার চেষ্টা করি। ধন্যবাদ।”

জিম ভাবলেন, হয়তো বেশ গুরুত্বপূর্ণ কেউ ফোন করেছেন, তাই তিনি ভদ্রতাসূচক জিজ্ঞাসা করলেন, “স্যারকে কিছু বলতে হবে? আপনি ইচ্ছে করলে কোনো বার্তা রেখে যেতে পারেন।”

“আমি পত্রিকার বিজ্ঞাপন দেখে ফোন দিয়েছিলাম। ঐ যে Visible Human শিরোনামের বিজ্ঞাপনটা। সেখানে একটি সুস্থ মানবদেহ চেয়ে বিজ্ঞাপন দেয়া হয়েছে। আমি আমার নিজের দেহ দান করতে আগ্রহী।” জিম হিথ যেন ঠিকমতো শুনতে পাননি। তিনি প্রশ্ন করলেন, “আপনি আপনার নিজের দেহ দান করতে চান?”

“জ্বী। আমি আমার দেহ দান করতে চাই। সেটা কেটেকুটে যা খুশি আপনারা করতে পারেন। আমার কোনো সমস্যা নেই।”

সুসান পটার; Source: Lynn Johnson
২০০০ সালের সেই দুপুর থেকে সুসান পটারের নাম ডাক্তার ভিক্টর স্পিৎজারের অফিসের সাথে স্থায়ীভাবে যুক্ত হয়ে গেলো। প্রথম প্রথম কেউ বিশ্বাস করতে চায়নি। আর করবেই বা কীভাবে? এমন কেউ আছে নাকি যে তার নিজের দেহ শেষকৃত্যে সমাধিস্থ হওয়ার বদলে এক বিবর্ণ ল্যাবরেটরির ছুরির নিচে ফেলার অভিপ্রায় করে! আর তারা ভেবেছিলেন, কোনো আত্মীয়ের মরদেহ হয়তো দান করা হবে। কিন্তু কয়েকবার দেখাসাক্ষাৎ হওয়ার পর ডাক্তার স্পিৎজার নিশ্চিত হলেন, সুসান পটার একদমই মজা করছেন না। এমনকি তিনি মানসিকভাবে অসুস্থও নন। আর যদি সত্যি সত্যি তার মৃত্যুর পর মরদেহ হস্তান্তর করা যায়, সেক্ষেত্রে সেটা হবে একটি বিপ্লব। ছোটখাট কোনো বিপ্লব নয়, একদম বিশাল বিপ্লব। আর সেই বিপ্লবের শিরোনাম হবে ‘সুসান পটার: দ্য লিভিং ক্যাডাভার’।

মরদেহ বিপ্লব
মাইকেল জে. একারম্যানের মাথায় এক চমৎকার বুদ্ধি আসলো। পেশায় ন্যাশনাল লাইব্রেরি অফ মেডিসিনের সহকারী পরিচালক মাইকেল একারম্যান বহুদিন যাবৎ শরীরতত্ত্বের সাথে আধুনিক কম্পিউটারের যোগাযোগ সৃষ্টির মাধ্যমে চিকিৎসা শিক্ষাব্যবস্থায় এক বিপ্লবের জন্ম দেয়ার চেষ্টা করছিলেন। কিন্তু প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতায় তিনি বেশিদূর এগিয়ে যেতে পারেননি। তবে তিনি হাল ছেড়ে দেননি। ১৯৮৭ সালে ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের এক লেকচারে তিনি তার এই অভিপ্রায়ের কথা জানালে অনেকেই আগ্রহী হয়ে ওঠে। এদের মধ্যে শরীরতত্ত্ব বিভাগের তৎকালীন সভাপতিও ছিলেন। গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিবর্গের উৎসাহ দেখে একারম্যান নতুন করে কাজে নেমে পড়লেন। তার আগ্রহের কেন্দ্রে ছিল মানবদেহ এবং তার ব্যবচ্ছেদবিদ্যা।

একারম্যানের মতে, ক্যাডাভার বা মরদেহ ব্যবচ্ছেদ একধরনের শিল্প। এখানে অভিজ্ঞতা, দক্ষতা এবং কৌশলের সংমিশ্রণে বেশ সতর্কতার সাথে একেকটি দেহ ব্যবচ্ছেদ করা হয়। তবে এই ব্যবচ্ছেদ করার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, যদি উপর থেকে ব্যবচ্ছেদ করা হয়, সেক্ষেত্রে তাহলে শরীরের অভ্যন্তরীণ কাঠামোগুলো একে অপরের সাথে কীভাবে সংযুক্ত রয়েছে, তা দেখা যায় না। আর একটি মরদেহকে বার বার ব্যবচ্ছেদ করাও সম্ভব হয় না। একারম্যান চিন্তা করলেন, যদি এমন কোনো উপায় বের করা যায় যেখানে আমরা একটি মরদেহকে যতবার খুশি ততবার ব্যবচ্ছেদ করতে পারবো! আর এর জন্য প্রয়োজন একটি ভার্চুয়াল ক্যাডাভার। আর সবচেয়ে বড় কথা, তারও আগে প্রয়োজন একটি সুস্থ ক্যাডাভার। আর এই ক্যাডাভার বিপ্লবে সেই কাঙ্ক্ষিত মরদেহ হিসেবে নিজেকে বিলিয়ে দেয়ার সিদ্ধান্ত নেন ক্যান্সার ফেরত বৃদ্ধা সুসান পটার।

ক্যাডাভারের যুগে বিপ্লব ঘটাতে চাচ্ছিলেন একারম্যান; Source: Sam Brasco
একজন সুসান পটার
“আমি স্বেছায় আমার দেহকে Visible Human Project এর জন্য দান করে দেবো। আমার মৃত্যুর পর তা প্রকল্পের দায়িত্বরত ব্যক্তিবর্গের নিকট হস্তান্তর করা হবে। প্রকল্পের কাজের অংশ হিসেবে তারা আমার দেহ ব্যবচ্ছেদ করে যেসব ছবি তুলবে, তা চিকিৎসাক্ষেত্রের স্বার্থে ইন্টারনেট কিংবা বই-পুস্তকে ব্যবহার করা যাবে। আমার মৃত্যুর পর ড. ভিক্টর স্পিৎজারকে পেজ করে খবর দিলেই হবে।”

সুসান পটার কীরকম নিঃস্বার্থ মানুষ ছিলেন তা বোঝার জন্য এই লেখাগুলোই যথেষ্ট। মৃত্যুর পূর্বে প্রায় ১৫ বছর ধরে তিনি এই লেখাসম্বলিত একটি কার্ড নিজের সাথে রাখতেন। যেন মরার পর পরই তার দেহ মানবকল্যাণে কাজে লেগে যেতে পারে। যেন বিপ্লবের অংশীদার হওয়ার লোভ সামলাতে পারছিলেন না একদণ্ড। এই মানুষটির জন্ম ১৯২৭ সালের ২৫ ডিসেম্বর জার্মানির লিপজিগ শহরে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর তিনি আটলান্টিক পাড়ি দিয়ে নিউ ইয়র্ক চলে আসেন। কয়েক বছর পর তিনি হ্যারি পটার নামক এক হিসাবরক্ষককে বিয়ে করেন। তাদের সংসারে দুটি কন্যা সন্তানের জন্ম হয়। পারিবারিক কারণে এই দম্পতি সন্তানসহ নিউ ইয়র্ক ছেড়ে ডেনভার শহরে চলে যান। ২০০০ সালে বিজ্ঞাপন দেখে ড. স্পিৎজারের সাথে যোগাযোগ করার পূর্বে বিভিন্ন দুর্ঘটনা, ক্যান্সার, মেলানোমা, মেরুদণ্ডের সার্জারি, ডায়াবেটিস, আলসার প্রভৃতি কারণে তার দেহ অনেকটা ক্ষয় হয়ে গিয়েছিল।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *