কেমন ছিল সোভিয়েত ইউনিয়ন?

৩৭ দিনের লম্বা কর্মসপ্তাহ, ৩০ দিন টানা কাজ করবেন, একদিনও ছুটি নেই, এরপর ৭ দিন আরামসে কাটাবেন। এভাবে কাজ করতে রাজি হবেন কি? আপনি রাজি থাকুন আর না থাকুন, কর্মজীবী মানুষ হিসেবে নিজেকে ঠিক ৯০ বছর পূর্বে কল্পনা করুন, ভ্লাদিমির লেনিনের দেশে আপনাকে এভাবেই হয়তো কাজ করতে হতো।

কথা হচ্ছিলো ইউনিয়ন অফ সোভিয়েত সোশ্যালিস্ট রিপাবলিকস, সংক্ষেপে ইউএসএসআর, যা আমাদের কাছে সোভিয়েত ইউনিয়ন নামে সর্বাধিক পরিচিত, সেই দেশটি নিয়ে। ১৯১৭ সালে রাশিয়ান বিপ্লবের পর রাশিয়ান সম্রাট বা জারের পতনের পর রাশিয়া ও আশেপাশের একই আদর্শের কয়েকটি রিপাবলিক নিয়ে গড়ে ওঠে সোভিয়েত ইউনিয়ন। ১৯১৭ এর পরের কয়েকটি বছর গৃহযুদ্ধ ও পাশাপাশি প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সাথে যুদ্ধের কারণে রাশিয়া ও সংলগ্ন এলাকা বেশ অস্থিতিশীল ছিল।

রাশিয়ার অভ্যন্তরে মূল সংঘাতটা চলছিল কমিউনিস্ট সমর্থক (যারা রেড নামে পরিচিতি পান) এবং জাতীয়তাবাদী সমর্থকদের মাঝে (যারা হোয়াইট নামে পরিচিতি পান)। হোয়াইটদের একটি অংশ ছিল সাবেক রাজতন্ত্রের সমর্থক। শেষ অবধি রেডরা ক্ষমতা সুসংহত করতে সক্ষম হয়। ইতিহাসে এরা বলশেভিক নামেও পরিচিত। বলশেভিকরা বিভিন্ন রিপাবলিকে ক্ষমতা দখল করে ঘোষণা করে জমি, কলকারখানা ও অন্যান্য সম্পদ একটা যৌথ সমবায় ব্যবস্থার অধীনে নিয়ন্ত্রিত হবে, যা দিয়ে অভিজাততন্ত্রের স্বার্থের বদলে কৃষক ও শ্রমিক সহ সকলের স্বার্থ রক্ষা করা যাবে। ১৯২২ সালের ৩০ ডিসেম্বর রাজতন্ত্র সমর্থকদের চূড়ান্ত পরাজয়ের মধ্য দিয়ে বিভিন্ন রিপাবলিকরা যুক্ত হতে শুরু করলে সোভিয়েত ইউনিয়নের আকার বড় হতে শুরু করে।

আয়তন
সোভিয়েত ইউনিয়নে মূলত রাশিয়া, ইউক্রেন, বেলারুশ এবং ট্রান্স ককেশিয়ান দেশগুলো যুক্ত ছিল, যার সাথে ১৯২৪ সালে তুর্কমান ও উজবেক যোগ দেয়। পরবর্তীতে ১৯২৯ সালে তাজিক সোভিয়েত সোশ্যালিস্ট রিপাবলিক এবং ১৯৩২ সালে কিরিগ ও কাজাখ সোভিয়েত সোশ্যালিস্টরা ইউনিয়নে যোগ দেয়।

সোভিয়েত ইউনিয়নের ম্যাপ
ট্রান্স ককেশিয়ান অংশটিকে আর্মেনিয়ান, জর্জিয়ান ও আজারবাইজান এসএসআরে বিভক্ত করা হয়। ১৯৪০ সাল নাগাদ লাটভিয়ান, লিথুনিয়ান, এস্তোনিয়ান, মালদোভাসহ বাল্টিক সাগর পাড়ের আরও কিছু অংশ সোভিয়েত ইউনিয়নে যুক্ত হয়। ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে পড়লে এ রিপাবলিকগুলো স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে জন্ম লাভ করে। সোভিয়েত ইউনিয়নের আয়তন ছিল ২,২৪,০০,০০০ বর্গ কিলোমিটার, যা সে সময়ের সর্ববৃহৎ দেশ। এই বিশাল রাষ্ট্রের মধ্যে ১১টি বিভিন্ন টাইম জোন ছিল। পূর্ব ইউরোপ থেকে শুরু হওয়া ইউনিয়নটি মধ্য এশিয়া হয়ে উত্তর এশিয়া পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল, যার রাজধানী ছিল রাশিয়ার মস্কোতে।

শাসন ব্যবস্থা
মস্কোতে অবস্থিত সুপ্রিম কাউন্সিল অফ দ্য ইউনিয়ন অফ সোভিয়েত সোশ্যালিস্ট রিপাবলিকের নিকট সোভিয়েত ইউনিয়নের সর্বোচ্চ ক্ষমতা ন্যস্ত ছিল। এই কাউন্সিল দুই চেম্বারে বিভক্ত, যার ভেতর একটি ছিল ৭৫০ সদস্যের সোভিয়েত অফ দ্য ইউনিয়ন এবং অপরটি ছিল ৭৫০ সদস্যের ইউনিয়ন অফ ন্যাশনালিটিজ। উভয় কক্ষেই নিয়মিত নির্বাচন হতো। তবে নির্বাচনে একমাত্র কমিউনিস্ট পার্টিই নির্ধারণ করতো কারা কোন কক্ষের সদস্য হবেন।

কাউন্সিল অফ পিপলস ডেপুটিজ, ১৯৯১
সোভিয়েত সংবিধান অনুসারে, স্থানীয় ও প্রাদেশিক পর্যায়ে শাসন পরিচালনার জন্য একটি স্তর ছিল যাদের বলা হতো কাউন্সিল অফ পিপলস ডেপুটিজ। এ কাউন্সিলগুলো সুপ্রিম কাউন্সিল কর্তৃক নির্ধারিত সিদ্ধান্তসমূহ স্থানীয় পর্যায়ে বাস্তবায়ন করতো। সুপ্রিম কাউন্সিল দেশের মূলনীতি ও বৈদেশিক সর্ম্পকসহ সকল বিষয়ে সিদ্ধান্তগ্রহণ করতো। রাষ্ট্রের মূল ক্ষমতা ছিল সুপ্রিম কাউন্সিল চেয়াম্যানের হাতে। স্ট্যালিন থেকে শুরু করে গর্বাচেভ পর্যন্ত সকল সোভিয়েত শাসকই এ চেয়ারম্যানের পদ অলংকৃত করেছেন।

নাগরিক সুবিধা
সোভিয়েত ইউনিয়ন পরিচালিত হতো কাল মার্কসের দর্শনানুসারে। রাষ্ট্রের নাগরিকদের বিনামূল্যে স্বাস্থ্য ও শিক্ষালাভের সুযোগ ছিল। পোস্ট গ্র্যাজুয়েশন পর্যন্ত সবাই বিনামূল্যে শিক্ষা পেতো। পানি, গ্যাস, সেন্ট্রাল হিটিংসহ নাগরিক বিভিন্ন সুবিধায় রাষ্ট্র প্রচুর পরিমাণে ভর্তুকি প্রদান করায় নাগরিকদের এ খাতে তেমন কোনো খরচ করতে হতো না।

পেশা ও চাকুরির শর্তানুসারে, বেতন নির্ধারিত হতো। ছাত্রদেরকেও রাষ্ট্র বেতন প্রদান করতো। ‍সকল চাকুরিজীবীকে ডরমেটরিতে আবাসন প্রদান করা হতো। পরবর্তীতে সকলকেই নিজস্ব বাসা প্রদান করা হতো। খুব অল্প কিছু বিশেষ দক্ষতা সম্পন্ন লোককে জীবনের শুরুতেই বড় অ্যাপার্টমেন্ট প্রদান করা হতো। মূলত মধ্যবিত্ত সম্প্রদায় ছিল সোভিয়েত সমাজের বৃহত্তর অংশ। অত্যন্ত ক্ষমতাবান গুটিকয়েক পার্টি সদস্যকে রাষ্ট্রের তরফ থেকে বিশেষ সুবিধা প্রদান করা হতো।

সোভিয়েত ইউনিয়ন আর বর্তমান জীবনযাপন মান নিয়ে করা একটি জরিপ
অর্থনীতি
সোভিয়েত অর্থনীতি ছিল কেন্দ্রীয়ভাবে নিয়ন্ত্রিত। ভূমি ও বাড়ির ব্যক্তিগত মালিকানা সোভিয়েত ইউনিয়নে নিষিদ্ধ ছিল। যদিও বলা হতো, সকল সম্পদের মালিক সোভিয়েত জনগণ, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে সম্পদের মালিক ছিল সোভিয়েত ইউনিয়ন সরকার। পঞ্চবাষির্কী পরিকল্পনা অনুসারে সোভিয়েত উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ করা হতো। ফলে আগামী পাঁচ বছর কী পরিমাণ পণ্য কারখানায় এবং কী পরিমাণ শস্য উৎপাদন হবে তা ৫ বছর আগেই নির্ধারিত হতো। ব্যক্তিগত প্রতিষ্ঠান তৈরির মাধ্যমে প্রতিযোগিতামূলক বাজার তৈরির ব্যবস্থা সোভিয়েত ইউনিয়নে ছিল না।

১৯২৮ থেকে ১৯৮৭ পর্যন্ত জাতীয় আয়ের চিত্র
আশির দশকের শেষের দিকে সোভিয়েত ইউনিয়নের অর্থনীতি তেল ও গ্যাস রপ্তানীর উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। তেলের মূল্য কমে গেলে তা সোভিয়েত সরকারের আমদানী ও রপ্তানী বাণিজ্যে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে, যা বাজেট ঘাটতি তৈরি করে। অর্থনীতির করুণ দশা কাটাতে সোভিয়েত সরকার বিভিন্ন সংস্কারমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করতে বাধ্য হয়। তবে দীর্ঘদিন ধরে এসব বিষয়ে যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ না করার দরুণ ১৯৮০ এর দশকে সোভিয়েত অর্থনীতি মারাত্মক মন্দার মুখে পড়ে।

সোভিয়েত নেতা মিখাইল গর্বাচেভ ১৯৮৫ সাল নাগাদ সোভিয়েত ইউনিয়নের শাসনকার্য এবং অর্থনীতিতে সংস্কার শুরু করেন, যা ইতিহাসে পেরেস্ত্রোইকা (পুনর্গঠন) ও গ্লাসনস্ত (উদারীকরণ) নামে খ্যাত। এ সময় কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত কেন্দ্রীয় অর্থনীতিতে উদারীকরণের ছোঁয়া লাগে, কিন্তু ততদিনে সোভিয়েত ইউনিয়নের বাজার চাহিদার সাথে অভ্যন্তরীণ উৎপাদনে মারাত্মক ঘাটতি শুরু হয়ে গেছে। ফলে বিলম্বিত উদারীকরণ খুব বেশি সুফল বয়ে আনতে পারেনি। তাছাড়া প্রতিযোগীতামূলক বাজারে পণ্য তৈরিতে বাকি বিশ্ব যেভাবে নতুন প্রযুক্তি গ্রহণ করেছিল, তার সাথে সোভিয়েত ইউনিয়নের অভ্যন্তরীণ উৎপাদন ব্যবস্থা খাপ খাওয়াতে না পারায় পণ্য উৎপাদন মারাত্মক প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হয়।

জনগণের ক্রয় ক্ষমতার একটি চিত্র
বৈদেশিক সর্ম্পক
এ সময় বিশ্ব রাজনীতি ও বৈদেশিক সর্ম্পকেও সোভিয়েত ইউনিয়ন নতুন দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করতে শুরু করে। গর্বাচেভ পূর্ব ইউরোপের সোভিয়েত ব্লকভুক্ত দেশগুলোর অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ বন্ধ করে দেন। ফলে তারা নিজেদের মতো করে বিভিন্ন বিষয়ে স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণ শুরু করে। তিনি একইসাথে পূর্ব ও পশ্চিম জার্মানির একত্রীকরণকে সমর্থন করেন। ইউরোপে ন্যাটো এবং ওয়ারশ চুক্তিভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে যে শীতল যুদ্ধ চলছিল, তা গর্বাচেভের পেরেস্ত্রোইকা ও গ্লাসনস্ত নীতির কারণে যুদ্ধে সমাপ্তি টানতে শুরু করে।

সোভিয়েত ইউনিয়ন ১৯২৯ সালে সাইনো-সোভিয়েত যুদ্ধে চীনকে পরাজিত করে। ১৯৩৯-৪০ সালে সোভিয়েতদের উত্তর দিকে সীমানা বৃদ্ধির ইচ্ছা থেকে শুরু হয় সোভিয়েত-ফিনিশ যুদ্ধ। সোভিয়েতরা ভেবেছিল এ যুদ্ধ তিন সপ্তাহে শেষ হবে, কিন্তু তা প্রায় দেড় বছর ধরে চলে, যা সোভিয়েত সেনাবাহিনীকে প্রচুর ক্ষতির সম্মুখীন করে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরুর দিকে সোভিয়েতরা জার্মানির সাথে চুক্তি করে যুদ্ধে যোগদান থেকে বিরত থাকে। তবে জার্মানি চুক্তি ভঙ্গ করে সোভিয়েত ইউনিয়নের উপর আক্রমণ শুরু করলে সোভিয়েত ইউনিয়ন মিত্রপক্ষে যোগ দেয় এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স ও ব্রিটেনের সাথে মিলিতভাবে যুদ্ধ শুরু করে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *